শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারোপাহাড় এলাকায় বন্যহাতি সুরক্ষায় হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। হাতি-মানুষের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব নিরসন এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করতে নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা রেঞ্জের আওতাধীন বাতকুচি এলাকায় এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম (ইআরটি), প্রকৃতিপ্রেমী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তাঁদের মতামত তুলে ধরেন।
‘হাতি বাঁচলে, বাঁচবে গারো পাহাড়’ এমন স্লোগানে শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাব এবং নাগরিক প্ল্যাটফরম জনউদ্যোগ, শেরপুর যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে সার্বিক সহযোগিতা করে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইইডি)।
জনউদ্যোগ, শেরপুর কমিটির আহবায়ক আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি পোদ্দার, সমন্বয়ক হাকিম বাবুল, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সংগঠক দেবদাস চন্দ, ইউপি সদস্য আজহারুল ইসলাম, ইআরটি সদস্য মো. আসমত আলী, টিম সদস্য ইলিয়াস খান প্রমুখ।
সভায় হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত আনসার আলী বলেন, পাহাড়ে হাতির খাবার উপযোগী বাগান করতে হবে, তাদের জন্য জলাধারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা মানুষের খাবারে হানা না দেয়। হাতিও বাঁচুক, মানুষও থাকুক গারো পাহাড়ে। হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাতে হলে গারোপাহাড়ে বন্যহাতির অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে।
ইআরটি সদস্য আজমত উল্লাহ বলেন, ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ভিউ ব্যবসায়ীরা এখন নতুন উৎপাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা বন্যহাতিকে নানাভাবে উত্যক্ত করছে। এতে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এসব ভিউ ব্যবসায়ী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দমাতে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরে বক্তারা হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসন ও ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে করণীয় বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁরা বলেন, পাহাড়ে হাতির বাস্তু সংস্থান ও খাবারের উপযোগী বৃক্ষের বাগান তৈরী করতে হবে। পানির আধার তৈরীর পদক্ষেপ নিতে হবে। লোকালয়ে বন্যহাতি আসা কমাতে হলে সীমান্ত জনপদে ধানসহ যেসব ফসল হাতির পছন্দের খাবার সেগুলোর আবাদ কমিয়ে মরিচসহ হাতির অপছন্দের খাবার ফলানোর দিকে নজর দিতে হবে। মৌমাছি চাষ করে বিকল্প আয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। হাতির চলাচলের পথ ছেড়ে দিতে হবে, সেসব স্থানে ছোট ছোট পুকুর কিংবা পানি ধারনের ব্যবস্থা করতে হবে। হাতিকে উত্যক্ত না করে কিংবা বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যা বন্ধ করে হাতির সাথে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তবেই কমে আসবে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব। বন্যহাতিকে কোনভাবেই উত্যক্ত করা যাবে না।
বন বিভাগের তথ্যমতে, শেরপুর জেলার পাহাড়ি জনপদে গত এক যুগে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৪৬ জন মানুষের। এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৩৪টি।
শেরপুর ওয়াইল্ডলাইফ বিভাগের রেঞ্জার মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন জানান, খাদ্য সংকটের কারণেই হাতি লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা সমাধানে পাহাড়ি বনাঞ্চলের প্রায় ৬ একর জমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো হয়েছে। তিন বছর বয়সি এসব গাছ আরও দুই-তিন বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ খাদ্য হিসাবে উপযোগী হয়ে উঠবে। তখন হাতির খাদ্য সংকট অনেকটাই কমবে এবং তারা বনেই অবস্থান করবে।
অপরদিকে, শেরপুর-২ (নালিতাবাড়ী-নকলা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী নালিতাবাড়ীর পাহাড়ি এলাকায় হাতির চলাচলের পথে ১৫টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। ক্যামেরাগুলো চালু হলে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা প্রদান এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।
শেরপুরে বন্যহাতি সুরক্ষায় পাহাড়ী জনপদে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
এই সংবাদটি পঠিত হয়েছে: 80 বার
দেবাশীষ সাহা রায়
উপদেষ্টা সম্পাদক
এই সাংবাদিকের মোট খবর: 58 টি
মন্তব্য করুন